ঢাকা | বঙ্গাব্দ

গাজা দখল : বিশ্বজুড়ে সমালোচনা

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ দখলের ইসরায়েলের পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেছে।
  • অনলাইন ডেস্ক | ০৯ আগস্ট, ২০২৫
গাজা দখল :  বিশ্বজুড়ে সমালোচনা গাজাবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা তাদের সামরিক বাহিনীকে গাজা শহর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। শুক্রবার এ খবর প্রকাশের পর দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ দখলের ইসরায়েলের পরিকল্পনার  কঠোর সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে এটি শুধু সংঘাতকে বাড়িয়ে তুলবে এবং আরও রক্তপাতের কারণ হবে। জেনেভা ও জেরুজালেম থেকে এএফপি এই খবর জানিয়েছে।


গাজা যুদ্ধে প্রায় দুই বছর পার হলেও যুদ্ধবিরতির জন্য নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়ছে। তবে তার মত এই অভিযানে ২ কোটিরও বেশি ফিলিস্তিনিকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচানো এবং ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের হাতে বন্দি ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করা সম্ভব হবে। এদিকে, হামাস লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এই পরিকল্পনাকে ‘নতুন যুদ্ধাপরাধ’ বলে সমালোচনা করেছে।


অপরদিকে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র জার্মানি এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে দেশটিতে সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি স্থগিত করেছে। জার্মানির আশঙ্কা, এসব অস্ত্র গাজায় ব্যবহার করা হতে পারে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎর্জ বলেন,‘ইসরায়েলের সামরিক পরিকল্পনা কীভাবে বৈধ লক্ষ্য পূরণ করবে তা বোঝা কঠিন। জার্মানির এই পদক্ষেপকে হামাসের জন্য পুরস্কার বলে নিন্দা জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। 


ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, হামাসকে ‘পরাজিত’ করার জন্য নতুন অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনারা গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং যুদ্ধবিহীন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মানবিক সহায়তা বিতরণ করবে। নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এর এক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা গাজা দখল করব না বরং গাজাকে হামাসের হাত থেকে মুক্ত করব।’ তিনি আরও বলেন, গাজায় নিরস্ত্রীকরণ হলে ও শান্তিপূর্ণ বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা হলে তা জিম্মিদের মুক্ত করতে সহায়ক হবে এবং ভবিষ্যৎ হামলার ঝুঁকি কমাবে।


ইসরাইল ১৯৬৭ সালে গাজা দখল করে, তবে ২০০৫ সালে সেনা ও বসতি সেখান থেকে সরিয়ে নেয়। নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, মন্ত্রিসভা পাঁচটি নীতি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে গাজার নিরস্ত্রীকরণ এবং এমন একটি বিকল্প বেসামরিক প্রশাসন গঠন, যা হামাসও নয়, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও নয়। পরিকল্পনাটি বিশ্বজুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। চীন, তুরস্ক, বৃটেনসহ বিভিন্ন আরব দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। 


যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়লের সর্বশেষ ঘোষণার প্রতি প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া না জানালেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, তিনি গাজার মানবিক সাহায্য বাড়ানোর দিকে মনোযোগী আছেন এবং বাকিটা ইসরাইলের ওপর নির্ভর করবে।


জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ বলে সতর্ক করেছেন। তার মতে, এটি ইতোমধ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে থাকা লক্ষাধিক ফিলিস্তিনির জীবন আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। গুতেরেস বলেন, ইসরায়েলের পরিকল্পনাটি ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ সৃষ্টি করবে যা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের অবস্থার অবনতি ঘটাবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রোববার এ বিষয়ে বৈঠক করবে।


জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, এই পরিকল্পনা‘তাৎক্ষণিক বন্ধ করা উচিত। ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ মানবিক সাহায্যের প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে বিনা প্রতিশ্রুতিতে বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে।


এদিকে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস ইসরাইলে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, নতুন পরিকল্পনা বৈধ লক্ষ্য অর্জনে কীভাবে সহায়ক হবে তা বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলে এ পরিকল্পনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, সেনারা ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছে।


জিম্মিদের পরিবারের প্রধান সংগঠন ‘হোস্টেজ অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিজ ফোরাম’ এই পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, এটা জিম্মিদের ‘পরিত্যাগ’ করার শামিল। সংগঠনটি জানিয়েছে, ‘মন্ত্রিসভা এমন একটা বেপরোয়া পদক্ষেপ নিয়েছে, যা জিম্মি, সৈন্য ও পুরো ইসরায়েলি সমাজের জন্য বিপদের কারণ হবে।’


স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি হামলা আরও বাড়লে, সেনারা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালাতে পারে যেখানে জিম্মিদের রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিছু ইসরাইলি অবশ্য এতে সমর্থন জানিয়েছেন। ইহুদিদের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছাত্র চেইম ক্লেইন (২৬) বলেন, ‘গাজা নিয়ন্ত্রণে নিলে তারা হামাসকে পুরোপুরি না হলেও বড় অংশে নির্মূল করবে।’ ইসরায়েলি সেনারা গত মাসে জানায়, তারা গাজা উপত্যকার ৭৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।


গাজার বাসিন্দারা আরও বাস্তুচ্যুতি ও হামলার আশঙ্কায় ভীত। ছয় সন্তানের মা মাইসা আল-শান্তি (৫২) এএফপিকে জানিয়েছেন, ‘তারা আমাদের কখনো দক্ষিণে যেতে বলে, কখনো উত্তরে। এখন আবার দক্ষিণে পাঠাতে চায়। আমরা মানুষ, কিন্তু কেউ আমাদের শুনছে না, দেখছে না।’


হামাস গাজা দখল করা ও এর বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাটি ‘গাজার বিরুদ্ধে একটি নতুন যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে সমালোচনা করেছে। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, এতে জিম্মিদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে এবং এই অভিযানে ইসরায়েলকে চরম মূল্য দিতে হবে।


ইরান: ‘জাতিগত নির্যাতন’


হামাসের সমর্থক ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাকাই বলেছেন, ইসরায়েলের পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা করার ইহুদিবাদী সরকারের নির্দিষ্ট অভিপ্রায়ের আরেকটি স্পষ্ট লক্ষণ।


চীন: গাজা ফিলিস্তিনিদের


চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, গাজা ফিলিস্তিনি জনগণের অংশ এবং এটি ফিলিস্তিনের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড। মানবিক সংকট নিরসনে, অবিলম্বে অস্ত্রবিরতি প্রয়োজন।


যুক্তরাজ্য: ‘আরও রক্তপাত’


প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, এই পদক্ষেপ কোনোভাবে সংঘাত শেষ করবে না বা বন্দীদের মুক্তি নিশ্চিত করবে না বরং আরও রক্তপাত ঘটাবে।


ফ্রান্স: ‘অন্ধকার পথ’


ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে‘ এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং সম্পূর্ণ অন্ধকার পথে নিয়ে যাবে।


কানাডা: মানবিক পরিস্থিতি


কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন , আমরা অনেকের সঙ্গে একমত যে এই পদক্ষেপ ভুল এবং এটি মানবিক পরিস্থিতির উন্নতিতে কোনো অবদান রাখবে না। কানাডা আগামী মাসে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা পুনর্ব্যক্ত করেন।


তুরস্ক: আন্তর্জাতিক চাপের আহ্বান


তুরস্ক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গাজার পরিকল্পনা বন্ধে চাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলেছে যে ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার ইসরাইলের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন রোধ করার জন্য আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাচ্ছি। 


স্পেন: ‘ধ্বংস ও দুঃখ’


স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেছেন ইসরায়েলের এই পরিকল্পনা শুধু ধ্বংস ও দুঃখই বয়ে আনবে। তিনি আরও বলেছেন, একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, মানবিক সাহায্যের তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক প্রবেশ এবং সমস্ত জিম্মিদের মুক্তি জরুরিভাবে প্রয়োজন।


সৌদি আরব: ‘জাতিগত নিধন’


সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক টুইটারে বলেছে ফিলিস্তিনি ভাইদের বিরুদ্ধে ক্ষুধা বর্বরতা ও জাতিগত নিধনের অপরাধের অব্যাহত ভাবে নিন্দা জানাই।


জর্ডান: ফিলিস্তিনিদের অধিকার


জর্ডানের রয়্যাল কোর্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে রাজা আবদুল্লাহ এই পদক্ষেপকে দুই-রাষ্ট্র সমাধান এবং ফিলিস্তিনি অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন।


মিশর:  কঠোর নিন্দা


মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে‘গাজার ওপর ইসরাইলের পরিকল্পনা সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষায় নিন্দা জানানো হয়।


জাতিসংঘ সমর্থিত এক জরিপে সতর্ক করা হয়েছে, গাজায় দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, চলতি বছর গাজায় অপুষ্টিতে অন্তত ৯৯ জন মারা গেছে, যা আসল সংখ্যার চেয়ে কম হতে পারে। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, গাজার ওপর বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার সময় ১৯ বছর বয়সী এক যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। 


সংস্থাটির মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেছেন, ‘ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মানুষের মাথায় ভারি ত্রাণের প্যাকেট পড়ে প্রতিদিনই আহত ও প্রাণহানি হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, ত্রাণ ফেলার জায়গায় ভিড় এবং পদদলিত হওয়ার কারণে প্রায়শই হতাহতের ঘটনা ঘটে। বাসাল আরও জানিয়েছে, শুক্রবার গাজাজুড়ে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল গাজায় কিছু ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দিলেও জাতিসংঘ বলছে, এর পরিমাণ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।


সূত্র: এএফপি


এসজেড