ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নেপালে নিহত বেড়ে ১৯

বহু তরুণ বিক্ষোভকারীর কাছে এই নিষেধাজ্ঞা ছিল সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা দীর্ঘ অসন্তোষের বিস্ফোরণ।
  • অনলাইন ডেস্ক | ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
নেপালে নিহত বেড়ে ১৯ দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নেপালে ফেসবুক, ইউটিউবসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি নেতৃত্বাধীন সরকার। সোমবার সকালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দুর্নীতি মোকাবেলার দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার শন্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ ভয়াবহ সহিংসতায় রুপ নিয়েছে। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী দেশটির পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছে। বিক্ষোভ দমনে কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন স্থানে কারফিউ এবং বিক্ষোভকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।


নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজারাম বাসনেত বলেছেন, স্থানীয় প্রশাসন আইন- ২০২৮ এর বিধান অনুসারে জেলা নিরাপত্তা কমিটির সুপারিশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিমালিয়ান জনিয়েছে, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও ২০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।


বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, কাঠমান্ডুতে ১৯ জন এবং আরেক শহর ইটাহারিতে দুজন নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে ট্রমা সেন্টার ৮ জন, এভারেস্ট হাসপাতাল ৩ জন, সিভিল হাসপাতাল ৩ জন, কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ ২ জন এবং ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতাল ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক মানুষ হাসপাতালগুলোতে আসার কারণে আহতদের সঠিক সংখ্যা এখনো অনিশ্চিত, তবে ধারণা করা হচ্ছে এটি ২০০ জনেরও বেশি। আহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী, নিরাপত্তা কর্মী এবং সাংবাদিকও রয়েছেন।


সরকার ২৬টি অনিবন্ধিত প্ল্যাটফর্ম ব্লক করার পর নেপালে শুক্রবার থেকে ফেসবুক, ইউটিউব এবং এক্সসহ বেশ কয়েকটি সোশ্যাল মিডিয়া সাইট অ্যাক্সেসযোগ্য নয়। এরফলে ব্যবহারকারীরা ক্ষুব্ধ এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। কাঠমান্ডু উপত্যকা পুলিশের মুখপাত্র শেখর খানাল এএফপি’কে বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত ১৯ জন বিক্ষোভকারী মারা গেছেন এবং পুলিশসহ প্রায় ১শ’ জন আহত হয়েছেন।’ 


সিভিল সার্ভিস হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর দীপক পাউডেল জানিয়েছেন, শুধুমাত্র ওই হাসপাতালেই একশ জনেরও বেশি আহত ব্যক্তিকে আনা হয়। তাদের অনেকেই রাবার বুলেটে আহত হয়েছেন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালগুলোকে আহত সকল বিক্ষোভকারীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।


তথ্য কর্মকর্তা রঞ্জনা নেপাল জানিয়েছেন, আহতদের অনেকেই নিকটবর্তী সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি এএফপি’কে বলেন, ‘হাসপাতালে এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। হাসপাতাল এলাকায়ও কাঁদানে গ্যাস প্রবেশ করেছে, যার ফলে ডাক্তারদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে’।


রাজধানী কাঠমান্ডুতে তরুণ বিক্ষোভকারীরা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে বিক্ষোভ শুরু করে এবং পরে সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। পার্লামেন্টের কাছে একটি নিষিদ্ধ এলাকা অতিক্রম করে এবং কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ার সাথে সাথে জনতা ক্রমশ বেড়ে যায়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করলে রাস্তায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ দেয়াল টপকে সংসদ চত্বরে প্রবেশ করে।


জেলা প্রশাসন প্রেসিডেন্টের বাসভবন, এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংসদভবনসহ শহরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কারফিউ জারি করেছে। দেশের অন্যান্য জেলায়ও একই রকম বিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছে। নেপালে ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলোর লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারী রয়েছে যারা বিনোদন, সংবাদ এবং ব্যবসার জন্য এসবের ওপর নির্ভর করে।


২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী যুজন রাজভান্ডারী বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা উত্তেজিত, কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়, আমরা এখানে জড়ো হয়েছি। আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই। আমরা নেপালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি।’


২০ বছর বয়সী আরেকজন ছাত্রী ইক্ষমা তুমরোক বলেন, তিনি সরকারের ‘কর্তৃত্ববাদী মনোভাবের’ বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই। অন্যরা এটা সহ্য করেছে, কিন্তু আমাদের প্রজন্মের সাথেই এর অবসান হতে হবে’। বিক্ষোভকারী ভূমিকা ভারতী বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিদেশে আন্দোলন হয়েছে এবং সরকার ভয় পাচ্ছে, এখানেও তা ঘটতে পারে’।


নিষেধাজ্ঞার পর থেকে টিকটকে সাধারণ নেপালিদের সংগ্রামের সঙ্গে রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসবহুল জিনিসপত্র এবং ব্যয়বহুল ছুটি কাটানোর তুলনামূলক ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়েছে, যা এখনও চালু রয়েছে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্তই এই বিক্ষোভের একক কারণ নয়, বহু তরুণ বিক্ষোভকারীর কাছে এই নিষেধাজ্ঞা ছিল সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা দীর্ঘ অসন্তোষের বিস্ফোরণ। 


সূত্র: এএফপি, দ্য হিমালয়ান


এসজেড