ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে গত এক দশকে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
ইউরোপের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে যেখানে ইইউতে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১১.৫৪ বিলিয়ন ইউরো, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮.২৮ বিলিয়ন ইউরোতে—অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার ৫৮ শতাংশেরও বেশি।
এ সময়ে ইউরোপের সামগ্রিক পোশাক আমদানি বেড়েছে মাত্র ২০.৪৭ শতাংশ, যা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা বেড়েছে এবং দেশটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সরবরাহকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাজেট পণ্য নয়, টেকসই পণ্যই বাংলাদেশের পরিচয়
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বাংলাদেশ এখন আর শুধু কম খরচের উৎপাদনশীল দেশ নয়। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, টেকসই মানদণ্ড এবং শ্রমিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বে উদাহরণ তৈরি করছি।”
মহামারির ধাক্কা, তারপর পুনরুদ্ধার
২০১৯ সালে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল ১৪.৯৬ বিলিয়ন ইউরো। কিন্তু পরের বছর, ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে তা কমে দাঁড়ায় ১২.৩২ বিলিয়ন ইউরোতে—ঘাটতির হার ১৭.৬৪ শতাংশ। তবে সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সময় নেয়নি বাংলাদেশ।
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে ৪৮.৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা একই সময় ইউরোপের পোশাক আমদানির প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। ইউরোপের মোট আমদানিও মহামারির বছর ২০২০-এ কমে গিয়েছিল ১৪.৩১ শতাংশ, তবে ২০২৪ সালে তা ঘুরে দাঁড়িয়ে পৌঁছায় ৮৫.৫৬ বিলিয়ন ইউরোতে।
উন্নত মান ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বাংলাদেশের মূল শক্তি
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ পরিবেশবান্ধব পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। বর্তমানে দেশে ২০০টিরও বেশি গ্রিন ফ্যাক্টরি রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোই বিশ্বে সর্বোচ্চ গ্রিন বিল্ডিং সনদপ্রাপ্ত।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা শুধু দাম নয়, বরং পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'এভরিথিং বাট আর্মস' (EBA) বাণিজ্য সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করেছে।
ভবিষ্যতের দিগন্ত
বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ তার বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ইউরোপসহ বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি আরও বাড়াতে পারবে।
বিশ্বব্যাপী যখন সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা, পরিবেশসচেতনতা এবং টেকসই উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রগুলোতে ইতিমধ্যেই অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এখন শুধু একটি পণ্য নয়, বরং বিশ্ববাজারে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানির ইতিবাচক প্রবণতা আরও সুদূরপ্রসারী হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
thebgbd.com/NIT