ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ডিম নিক্ষেপ শুধু অপমানই নয়, এক রাজনৈতিক বার্তাও

খাবারের টেবিলে ডিম যতই সাধারণ হোক, রাজনীতি ও প্রতিবাদের মঞ্চে বহুবার এটি রূপ নিয়েছে এক প্রতীকী ও শক্তিশালী প্রতিবাদী অস্ত্রে।
  • নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
ডিম নিক্ষেপ শুধু অপমানই নয়, এক রাজনৈতিক বার্তাও ছবি : সংগৃহীত।

খাবারের টেবিলে ডিম যতই সাধারণ হোক, রাজনীতি ও প্রতিবাদের মঞ্চে বহুবার এটি রূপ নিয়েছে এক প্রতীকী ও শক্তিশালী প্রতিবাদী অস্ত্রে। 


সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরেও ডিম ছোড়ার ঘটনা বেশ কয়েকবার সামনে এসেছে—বিরোধী নেতাকর্মী বা আদালতে আসামিদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের প্রবণতা যেন বেড়েই চলেছে।


যদিও এই ডিম ছোড়ে ক্ষোভ প্রকাশ করার ইতিহাস মোটেও নতুন নয়। বরং ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, বহু আগেই এটি একটি প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কথিত আছে, মধ্যযুগে অপরাধীদের শাস্তিস্বরূপ জনসমক্ষে তাদের ওপর ডিম ছোড়া হতো।


লিখিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮শ শতকে ডিম ছোড়ার ঘটনা প্রথমবার দলিলভুক্ত হয়। যুক্তরাজ্যের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ ‘আইল অব ম্যান’-এ মেথোডিস্টদের বিরুদ্ধে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এরপর ১৮৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের কনকোর্ডে দাসপ্রথা বিরোধী বক্তৃতার সময় কবি জর্জ হোয়াইটকে লক্ষ্য করেও ছোড়া হয়েছিল ডিম।

 

১৯১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বিলি হিউজ এক জনসভায় ডিমের আঘাতে পড়েন। তখন দেশজুড়ে কনস্ক্রিপশন (জোরপূর্বক সামরিক ভর্তি) বিরোধী আন্দোলন চলছিল, যার অংশ হিসেবেই ওই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিতর্ককে আরও তীব্র করে তোলে।


২০০১ সালে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটের গায়ে এক তরুণ কৃষক ডিম ছুঁড়ে মারেন, যার জবাবে প্রেসকট রীতিমতো ঘুষি মারেন ওই তরুণকে। মুহূর্তটির ছবি ও ভিডিও দুনিয়াজুড়ে ভাইরাল হয়, এবং ডিম ছোড়ার রাজনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।


এই তালিকায় আরও আছেন হলিউড অভিনেতা ও ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাক্তন গভর্নর আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার। ২০০৩ সালে নির্বাচনী প্রচারণাকালে তাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হলেও তিনি তা সিনেমার দৃশ্যের মতো অনায়াসে হাত দিয়ে সরিয়ে দেন।


২০০৪ সালে ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ বিরোধীদের ছোড়া ডিমে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০১১ সালে আফগান বিক্ষোভকারীরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ইরানের কনস্যুলেট লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করেন। আবার ২০১৩ সালে প্রয়াত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় একদল বিক্ষোভকারী তার কফিনে ডিম ছোড়ার হুমকি দেয়—যদিও কড়া নিরাপত্তার কারণে তা সম্ভব হয়নি।


একই বছর ফ্রান্সে ডিমের দাম পড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ কৃষকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তায় প্রতিদিন লক্ষাধিক ডিম ভাঙার ঘোষণা দেয়।


এই প্রসঙ্গে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক অ্যান্ড্রু গেলম্যান বলেন, খাবার ছুড়ে প্রতিবাদ করার মূল কারণ হলো—এটা সস্তা, সহজলভ্য ও দৃশ্যমান।


তিনি বলেন, টমেটো হালকা, ছুড়তে সহজ এবং দাম কম। আর ছুড়ে মারলে ফেটে গিয়ে একধরনের ‘সার্থকতা’ তৈরি করে। ডিমের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এটি ফেটে গিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবং একটি প্রতীকী বার্তা দেয়।


গেলম্যান আরও যোগ করেন, খাবার ছুড়ে প্রতিবাদ করাকে অনেক সময় অহিংস প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। কারণ, পুলিশের দিকে পাথর ছুঁড়লে প্রতিক্রিয়া মারাত্মক হতে পারে, কিন্তু ডিম ছোড়া হলে তা নিয়ে অতটা সহিংসতা ঘটে না। বরং ডিম ছোড়ার মধ্যে একধরনের নাটকীয়তা ও সামাজিক বার্তা রয়েছে।


এই ইতিহাস থেকেই স্পষ্ট, ডিম কেবল পুষ্টিকর খাদ্য নয়, সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী এটি রূপ নিতে পারে এক শক্তিশালী প্রতিবাদের প্রতীকে।


thebgbd.com/NA