ইসরায়েল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, হামলার দ্বিতীয় বার্ষিকী মঙ্গলবার পালন করছে। এমন একটি সময় তারা এইবার্ষিকী পালন করছে যখন মার্কিন প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার আওতায় গাজায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হামাস ও ইসরায়েলি আলোচকরা পরোক্ষ আলোচনা করছে। খবর বার্তাসংস্থা এএফপি’র।
দুই বছর আগে, ইহুদি উৎসব সুক্কোতের সমাপ্তিতে, ইর্স্ইালের ওপর আকস্মিক হামলা শুরু হয়, যা দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক দিন। ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা গাজা-ইসরায়েল সীমান্ত অতিক্রম করে, দক্ষিণ ইসরায়েলি বসতি এবং একটি মরুভূমি সঙ্গীত উৎসবে গুলি, রকেট ও গ্রেনেড ছুঁড়ে হামলা চালায়।
এএফপির সরকারি ইসরায়েলি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, এই হামলায় ইসরায়েলি পক্ষের ১২১৯ জন নিহত হয়। হামাস গাজায় ২৫১ জন জিম্মিকে অপহরণ করে, যাদের মধ্যে ৪৭ জন এখনও বন্দী।
বার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার ইসরায়েল এক স্মরণ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করে। নোভা সঙ্গীত উৎসবে নিহতদের পরিবার ও বন্ধুরা হামলার স্থানে জড়ো হয়। তেল আবিবের হোস্টেজেস স্কোয়ারে আরেকটি অনুষ্ঠান হয়েছে, যেখানে বন্দি মুক্তির আহ্বানে সাপ্তাহিক সমাবেশ অব্যাহত রেখেছে। ১৬ অক্টোবর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একটি স্মরণসভার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সোমবার অনেক ইসরায়েলি নোভা উৎসবস্থলে যান। শিক্ষক এলাদ গাঞ্চ মৃতদের শোক প্রকাশ করতে গিয়ে এএফপিকে বলেন, ‘এটি এখানে ঘটে যাওয়া একটি অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিশাল ঘটনা। কিন্তু সবকিছু সত্ত্বেও আমরা বেঁচে থাকতে চাই এবং আমাদের জীবন চালিয়ে যেতে চাই, তাদের স্মরণ করে- যারা এখানে ছিলেন এবং দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সঙ্গে আজ আর নেই ।’
এদিকে, গাজায় আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথে ইসরায়েলের প্রতিশোধমূলক সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এ পর্যন্ত ৬৭ হাজার ১৬০ জন নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, এই পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্য। নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু।
পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল এবং জল সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। লাখ লাখ গৃহহীন গাজাবাসী এখন জনাকীর্ণ শিবির ও খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে যেখানে খাবার, জল বা স্যানিটেশনের খুব কম সুযোগ রয়েছে।
জাবালিয়ায় নিজ বাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৬ বছর বয়সী হানান মোহাম্মদ বলেন, ‘এই যুদ্ধে আমরা আমাদের ঘরবাড়ি, পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী সবকিছু হারিয়েছি। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার জন্য এবং এই অবিরাম রক্তপাত ও মৃত্যু বন্ধ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারছি না। ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সাম্প্রতিক জরিপ অনুসারে, দুই বছরের সংঘাতের পর, ইসরায়েলি জনগণের ৭২ শতাংশ বলেছেন, তারা যুদ্ধ পরিচালনার সরকারের পদ্ধতিতে অসন্তুষ্ট।
সোমবার মিশরের রিসোর্ট শহর শার্ম এল-শেখে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা কড়া নিরাপত্তার মধ্যে প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা করছেন। মিশরের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত আল-কাহেরা নিউজ জানিয়েছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনার অধীনে জিম্মি-বন্দী বিনিময়ের জন্য ‘স্থল পরিস্থিতি প্রস্তুত করার’ ওপর আলোচনা কেন্দ্রীভূত ছিল।
হামাস আলোচকদের ঘনিষ্ঠ একটি ফিলিস্তিনি সূত্র জানিয়েছে, ৭ অক্টোবরের বার্ষিকীর প্রাক্কালে শুরু হওয়া এই আলোচনা বেশ কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। ট্রাম্প আলোচকদের গাজায় যুদ্ধ শেষ করার জন্য ‘দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন। তবে, সোমবারও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত ছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিউজম্যাক্স টিভিকে বলেছেন, ‘আমি মনে করি, আমরা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি। আমার মনে হয় এখন অনেক সদিচ্ছা দেখানো হচ্ছে। আসলে এটি বেশ আশ্চর্যজনক।’ যদিও উভয় পক্ষ ট্রাম্পের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে, এর বিস্তারিত বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো একটি কঠিন কাজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধে এর আগে দুটি যুদ্ধবিরতি দেখা গেছে, যার ফলে কয়েক ডজন জিম্মি মুক্তি পেয়েছে। তবে, ইসরায়েলি সামরিক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির সতর্ক করেছেন, যদি এই আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে সামরিক বাহিনী গাজায় ‘যুদ্ধে ফিরে যাবে।’
সূত্র: এএফপি
এসজেড