ঢাকা | বঙ্গাব্দ

শান্তিতে নোবেল পেলেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো

  • অনলাইন ডেস্ক | ১০ অক্টোবর, ২০২৫
শান্তিতে নোবেল পেলেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো মারিয়া কোরিনা মাচাদো।

২০২৫ সালের শান্তি পুরস্কার পেলেন ভেনিজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদো। শুক্রবার (১০ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায়) নরওয়ের রাজধানী অসলোর নোবেল ইনস্টিটিউট থেকে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে উদ্বুদ্ধ করা এবং দেশটিকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে একনায়কতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক পথে নেওয়ার আন্দোলনের জন্য তাকে নোবেল দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নোবেল কমিটি।


নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি জানিয়েছে, গত এক বছর ধরে মাচাদোকে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। নিজের জীবনের গুরুতর হুমকি থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশেই থেকে গেছেন, এমন একটি সিদ্ধান্ত যা লাখ লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি তার দেশের বিরোধী দলকে একত্রিত করেছেন। ভেনেজুয়েলার সমাজের সামরিকীকরণ প্রতিরোধে তিনি কখনও দ্বিধা করেননি। গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ উত্তরণের জন্য অবিচল ছিলেন মাচাদো।


তারা বলেছে, ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র আন্দোলনের নেত্রী মারিয়া কোরিনা লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। গভীর বিভাজনে জর্জরিত দেশটির বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি। মুক্ত ও অবাধ নির্বাচন এবং জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের দাবিতেই সকল বিরোধী শক্তি তার নেতৃত্বে এক কাতারে শামিল হয়েছে।


ভেনেজুয়েলা একসময় তুলনামূলকভাবে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল দেশ ছিল। কিন্তু দেশটি এখন এক নির্মম, স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যা এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ডুবে আছে। হাতেগোনা কিছু সুবিধাভোগী নিজেদের আখের গোছালেও, ভেনেজুয়েলার বেশিরভাগ মানুষ চরম দারিদ্র্যের শিকার। রাষ্ট্র তার হিংস্র দমন-পীড়ন ব্যবহার করছে দেশের সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধেই। এ কারণে প্রায় ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলান নিজ দেশ ছেড়েছেন। নির্বাচন কারচুপি, মিথ্যে মামলা আর কারাদণ্ডের মাধ্যমে বিরোধী পক্ষকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে।


ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো প্রায় অসম্ভব। তা সত্ত্বেও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে মারিয়া সবসময় তৎপর ছিলেন। তার সাহসী বক্তব্য ‘বুলেট নয়, আমরা ব্যালটকেই বেছে নিয়েছি’ তাকে ব্যাপক আলোচিত করে তোলে। এরপর থেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে এবং বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের পক্ষে অবিরাম লড়াই করে চলেছেন। ভেনেজুয়েলার জনগণের মুক্তির জন্য তিনি বছরের পর বছর ধরে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।


২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বিরোধী জোটের মনোনীত প্রার্থী হন মারিয়া। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তার প্রার্থিতা বাতিল করে দেয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি ভিন্ন দলের প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উররুটিয়াকে সমর্থন জানাতে পিছপা হননি। এরপর রাজনৈতিক মতবিরোধ ভুলে লাখ লাখ স্বেচ্ছাসেবক একজোট হন। নির্বাচন যেন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়, সেটি নিশ্চিত করতে তাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। হয়রানি, গ্রেপ্তার বা অত্যাচারের মারাত্মক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, সারা দেশের নাগরিকরা ভোটকেন্দ্রে কড়া নজরদারি বজায় রাখেন। তারা নিশ্চিত করেন যে চূড়ান্ত গণনা সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে, যাতে সরকার ব্যালট নষ্ট করে মিথ্যা ফলাফল ঘোষণা করে জনগণের রায় চুরি করতে না পারে। 


২০২৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করে জাপানি সংগঠন নিহোন হিদানকিও। এটি একটি পরমাণু অস্ত্র-বিরোধী সংগঠন, যা হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা হামলায় বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতিনিধিত্ব এবং পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়তে কাজ করে। তার আগে ২০২৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান ইরানের কারাবন্দি মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদী। এ বছর নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয় ৩৩৮ জনকে। যার মধ্যে ২৪৪ জন হলেন ব্যক্তি। আর বাকি ৯৪টি মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকে।


১৯০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ১১৪ বার নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১১ জন ব্যক্তি এবং ৩১টি সংস্থা মিলে পুরস্কার বিজয়ীর সংখ্যা ১৪২। রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটি তিনবার (১৯১৭, ১৯৪৪, ১৯৬৩) নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে, এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার দপ্তর দুইবার (১৯৫৪ ও ১৯৮১) পুরস্কার লাভ করেছে। বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক ২০০৬ সালে সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।


২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান পাকিস্তানের মালালা ইউসুফ জাই। তার চেয়ে কম বয়সে আর কেউ নোবেলে ভূষিত হয়নি। অপরদিকে ১৯৯৫ সালে ৮৬ বছর বয়সে নোবেল পান জোসেফ রোটব্লাট। এছাড়া এখন পর্যন্ত ৩১টি প্রতিষ্ঠান নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে।


প্রথা অনুযায়ী, অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার হিসেবে ৬ অক্টোবর চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। চলতি বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ৩ বিজ্ঞানী- মেরি ব্রাঙ্কো, ফ্রেড রামসডেল এবং শিমন সাগাগুচি। পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স নিয়ে গবেষণার জন্য তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়।


মঙ্গলবার ৭ অক্টোবর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে ২০২৫ সালে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ. ডেভোরেট এবং জন এম মার্টিনিস। বৈদ্যুতিক সার্কিটে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং এবং শক্তি পরিমাপ আবিষ্কারের জন্য তাদের মনোনীত করা হয়।


বুধবার ৮ অক্টোবর ঘোষণা করা হয় রসায়নে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম। এ বছর যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুসুমু কিতাগাওয়া, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড রবসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর এম. ইয়াঘি। ধাতু-জৈব কাঠামোর উদ্ভাবনের জন্য তাদের মনোনীত করা হয়। 


এছাড়াও গতকাল বৃহস্পতিবার ৯ অক্টোবর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। মনোমুগ্ধকর এবং দুরদর্শী রচনার জন্য ২০২৫ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন হাঙ্গেরিয়ান লেখক লাস্জলো ক্রাজনাহোরকাই।


সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৩ অক্টোবর, সুউডেনের স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে এবং বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে অর্থনীতি ক্যাটাগরির পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বছর নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শেষ হবে।


আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে স্টকহোম ও অসলোতে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেওয়া হবে। এ সময় প্রতি বিষয়ের বিজয়ীদের হাতে ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার চেক, একটি মানপত্র এবং একটি স্বর্ণপদক প্রদান করা হবে। ২০২৩ সালে সুইডিশ ক্রোনারের মূল্যস্ফীতির কারণে প্রাইজ মানির পরিমাণ ১০ মিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি করে ১১ মিলিয়ন ক্রোনা করা হয়।


সূত্র: রয়টার্স


এসজেড