রাজধানীর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের খালপাড় এলাকায় মঙ্গলবার দুপুরে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)–এর ট্রাক সেলে পণ্য কিনতে গিয়ে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য নিতে ভিড়ের চাপে দুই নারী সড়কে পড়ে যান। পরে ট্রাকটি স্থান ত্যাগ করলে অনেক অপেক্ষমাণ মানুষ পণ্য না পেয়েই ফিরে যান।
ঘটনাস্থলে থাকা ফটোসাংবাদিক দীপু মালাকার মানুষের হুড়োহুড়ি ও নারী পড়ে যাওয়ার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবিতে নিম্নআয়ের মানুষের সংগ্রামের করুণ চিত্র ফুটে ওঠে।
তিনি জানান, ট্রাক সরে যাওয়ার পর আহত নারীদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার ভাষায়, “সংসার টিকিয়ে রাখার কষ্টটা মা-বোনদেরই বেশি—ছবি তোলার পর সেটা আরও স্পষ্ট হয়েছে।”
চাহিদার চেয়ে কম সরবরাহ, বাড়ছে বিশৃঙ্খলা
টিসিবির পরিবেশক রেজাউল করিম বলেন, একটি ট্রাকে যতজনের জন্য পণ্য আনা হয়, লাইনে দাঁড়ান তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ। ফলে প্রতিদিনই হুড়োহুড়ির ঘটনা ঘটছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, সারা দেশে ৪৫০টি ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন পণ্য বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য বরাদ্দ থাকলেও দেড় থেকে দ্বিগুণ মানুষ লাইনে দাঁড়ান।
রমজান উপলক্ষে ১৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ ট্রাক সেল চলবে ১২ মার্চ পর্যন্ত। রাজধানীতে প্রতিদিন ৫০টি স্থানে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এ উদ্যোগ অপ্রতুল বলে মনে করছেন অনেকেই।
৫৯০ টাকায় পণ্য, সাশ্রয় প্রায় ৩৫০ টাকা
ট্রাক সেলে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও আধা কেজি খেজুর কিনতে পারেন। সব মিলিয়ে খরচ হয় ৫৯০ টাকা। একই পণ্য বাজারে কিনতে লাগে প্রায় ৯৫০ টাকা। অর্থাৎ একজন ক্রেতার সাশ্রয় হয় প্রায় ৩৫০ টাকা। এই সামান্য সাশ্রয়ের জন্যই ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নিম্নআয়ের মানুষকে।
খামারবাড়ি এলাকায় ট্রাক সেলের লাইনে দাঁড়ানো রাজমিস্ত্রি মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, “বাজারের তুলনায় কিছুটা কমে পাই, তাই কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকি।”
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি নেই
দেশে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নেমে আসে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। তবে গত ১৮ মাসে তা ৮ শতাংশের নিচে নামেনি। অর্থাৎ আগে ১০০ টাকায় যে পণ্য কেনা যেত, এখন তা কিনতে লাগে প্রায় ১০৮ টাকা।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ শতাংশের বেশি হতে পারে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসি–র হিসাবে, ২০২৫ সালের মে মাসে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এছাড়া ১৮ শতাংশ পরিবার যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রত্যাশা নতুন সরকারের দিকে
অর্থনীতিবিদ ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনে তীব্র চাপ তৈরি করেছে। তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা যে কোনো সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নতুন সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে মাসে আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের পণ্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে টিসিবির ৬৬ লাখ সক্রিয় ফ্যামিলি কার্ড রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন না করলে টিসিবির ট্রাকের পেছনের এই দীর্ঘ লাইন আরও দীর্ঘ হতে পারে।
thebgbd.com/NA